লাইভমক্কা লাইভ
দৈনিক রুদ্রখবর

ক্রাইম

রেলওয়ের প্রায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিতর্ক, তহসিলদার বদুর বিরুদ্ধে জমির নথি জালিয়াতির অভিযোগ

ভাঙ্গায় জমির মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে আইনি জটিলতা; ইউএনওর শোকজের খবর, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

দৈনিক রুদ্র খবরদৈনিক রুদ্র খবররবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৯:২৫ PM
রেলওয়ের প্রায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিতর্ক, তহসিলদার বদুর বিরুদ্ধে জমির নথি জালিয়াতির অভিযোগ

ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার তুজারপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার বদীউজ্জামান বদুর বিরুদ্ধে জমির মালিকানা, দলিল-নথিপত্র এবং রেলওয়ে প্রকল্পের অধিগ্রহণ ক্ষতিপূরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সদরদী মৌজার একটি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রকৃত ওয়ারিশদের ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জমিটির বিপরীতে প্রায় চার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণের অর্থের বৈধ দাবিদার শনাক্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের দাবি উঠেছে।

 তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, অধিগ্রহণের নথি, আদালতের আদেশ ও প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফল যাচাই করা জরুরি।

দলিল ঘিরে প্রশ্ন, ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার অভিযোগ

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নিবন্ধিত একটি সাফ-কবলা দলিল। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলিল নম্বর ২২০২/২০১৬, নিবন্ধনের তারিখ ১৭ মে ২০১৬। এতে কাপুড়িয়া সদরদী এলাকার লুৎফর রহমান মোল্যার কাছ থেকে সদরদী মৌজার এসএ দাগ নম্বর ১৬৬৫ এবং আরএস/বিএস দাগ নম্বর ২৬৮৫-সংশ্লিষ্ট ২০ শতাংশ জমি ক্রয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, জমি ক্রয়ের আর্থিক লেনদেন ও পরবর্তী কার্যক্রমে তহসিলদার বদীউজ্জামান বদুর ভূমিকা ছিল। তাঁদের আরও অভিযোগ, জমিটির অন্য দাবিদার ও ওয়ারিশদের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই কয়েকজনের নামে মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।

অভিযোগে দলিলের গ্রহীতা হিসেবে মোঃ শহীদুল ইসলাম, কৃষ্ণ চন্দ্র বর্মন, যুধিষ্ঠির বর্মন, বিপুল কুমার দাস, মোঃ বদরুদ্দোজা খান ও বিদ্যুৎ কুমার বর্মনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে দলিলের প্রত্যয়িত অনুলিপি, অর্থ পরিশোধের প্রমাণ এবং জমির ওয়ারিশসংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে তাঁদের কারও বিরুদ্ধে জালিয়াতি বা প্রতারণায় জড়িত থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও অংশীদারত্ব নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এবং আদালতের নথি গুরুত্বপূর্ণ।

রেলওয়ের ক্ষতিপূরণ: প্রায় চার কোটি টাকা নিয়ে কী ঘটেছে?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেলওয়ে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, জমিতে অস্থায়ী ঘর বা স্থাপনা নির্মাণ দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ নেওয়া হয়েছে এবং মূল জমির ক্ষতিপূরণের প্রায় চার কোটি টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা চলছে।

অভিযোগকারীরা আশঙ্কা করছেন, প্রকৃত মালিক ও ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ অন্যদের অনুকূলে ছাড়ের চেষ্টা হতে পারে। এ কারণে তাঁরা অধিগ্রহণের সম্পূর্ণ নথি, ক্ষতিপূরণের দাবিদারদের তালিকা, স্থাপনার মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং অর্থ ছাড়ের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

তবে প্রায় চার কোটি টাকা বর্তমানে ঠিক কোন দপ্তরের হিসাবে রয়েছে, কত টাকা ইতিমধ্যে ছাড় হয়েছে, কারা অর্থ পেয়েছেন এবং অর্থ আটকে থাকার পেছনে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি দিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অর্থাৎ, ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট অধিগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানা জরুরি।

আদালতে মামলা, নিষ্পত্তি নিয়ে অপেক্ষা

অভিযোগকারীদের দাবি, জমির মালিকানা ও অধিকার নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁরা আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। মামলাটি কোন আদালতে বিচারাধীন, মামলার নম্বর কী, আদালত ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন কি না এবং সর্বশেষ আদেশ কী—এসব তথ্য যাচাই করা গেলে বিরোধের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে।

আইনগতভাবে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ওয়ারিশসংক্রান্ত কাগজপত্র ও আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে থাকার কারণে জমির মালিকানা বা ক্ষতিপূরণের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সম্পদের উৎস নিয়ে অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

তহসিলদার বদীউজ্জামান বদুর বিরুদ্ধে ভাঙ্গা ও ফরিদপুর শহরে একাধিক বহুতল ভবন ও বিলাসবহুল স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, এসব সম্পদের বৈধ উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে কোনো ব্যক্তির সম্পদ থাকাই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সম্পদের মালিকানা, ক্রয়ের সময়কাল, আয়ের বৈধ উৎস, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন এবং প্রযোজ্য সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করা দরকার। অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন একই উপজেলায় কর্মরত থাকা বা বদলির পর পুনরায় একই এলাকায় ফিরে আসার বিষয়ে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বদলির আদেশ, যোগদানপত্র ও চাকরির নথি পরীক্ষা করেও প্রকৃত তথ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

ইউএনওর শোকজের খবর, প্রশাসনিক পদক্ষেপ কতদূর?

বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তহসিলদার বদীউজ্জামান বদুর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগে ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে শোকজ নোটিশের মূল কপি, নোটিশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, জবাব দেওয়ার সময়সীমা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া বা চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়া নয়; এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি

ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে কয়েকটি বিষয়ের স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন—

১. প্রায় চার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের সরকারি নথিতে প্রকৃত দাবিদার কারা?

২. জমি ও স্থাপনার বিপরীতে কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা বিতরণ এবং কত টাকা অবশিষ্ট রয়েছে?

৩. দলিল নম্বর ২২০২/২০১৬-এর ভিত্তিতে জমির মালিকানা ও ওয়ারিশদের অধিকার কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে?

৪. ক্ষতিপূরণের অর্থ আটকে থাকলে তার কারণ আদালতের আদেশ, মালিকানা বিরোধ, নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত?

৫. তহসিলদার বদীউজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না এবং শোকজের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

৬. অভিযোগে উল্লেখ করা স্থাবর সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়েছে কি না?

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ

অভিযোগগুলোর বিষয়ে তহসিলদার বদীউজ্জামান বদুর বক্তব্য, ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ফরিদপুর জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে অধিগ্রহণ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন। এ প্রতিবেদনের জন্য তাঁদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

দৈনিক রুদ্র খবরের পক্ষ থেকে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থের হিসাব প্রকাশ এবং প্রকৃত মালিকদের আইনগত অধিকার সুরক্ষার দাবি জানানো হচ্ছে।

 অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও নথিও সমান গুরুত্বে প্রকাশ করা জরুরি।

সরকারি অর্থ ও ভূমির মালিকানা নিয়ে এমন বিরোধে স্বচ্ছ তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য সামনে আনতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

একটি মন্তব্য লিখুন