লাইভমক্কা লাইভ
দৈনিক রুদ্রখবর

জাতীয়

জেল হত্যা দিবস আজ: কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

আজ ৩ নভেম্বর, ঐতিহাসিক জেল হত্যা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি এক বেদনাবিধুর, কলঙ্কিত ও শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চার জাতীয় নেতা।

দৈনিক রুদ্র খবরদৈনিক রুদ্র খবরমঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ১:২৩ PM
জেল হত্যা দিবস আজ: কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

জেল হত্যা দিবস আজ: কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক রুদ্র খবর

আজ ৩ নভেম্বর, ঐতিহাসিক জেল হত্যা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি এক বেদনাবিধুর, কলঙ্কিত ও শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চার জাতীয় নেতা। তাঁরা হলেন—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য নেতৃত্ব ও অবদানের জন্য এই চার নেতা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। অথচ স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় তাঁদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয় কারাগারের ভেতরেই। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড আজও গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।

গভীর রাতে কারাগারে সশস্ত্র সেনাদের আগমন

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর গভীর রাত। ঢাকা তখন রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতায় উত্তাল। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান নিয়ে চলছিল নানা তৎপরতা।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া তৎকালীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আমিনুর রহমানের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, রাত আনুমানিক দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে সশস্ত্র সেনাসদস্যদের বহনকারী একটি পিকআপ কারাগারের প্রধান ফটকে এসে থামে।

সেনাসদস্যরা কারা মহাপরিদর্শকের কাছে একটি কাগজ দেন। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পর সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশ অনুসরণ করার কথা জানানো হয় বলে জেলার আমিনুর রহমান তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন।

এরপর কারাগারে বন্দি থাকা চার জাতীয় নেতাকে একত্র করার নির্দেশ আসে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদকে একটি কক্ষ থেকে এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে অন্য কক্ষ থেকে সেখানে নিয়ে আসা হয়।

কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ

জেলার আমিনুর রহমানের বর্ণনায়, চার নেতাকে একত্র করার সময় তাজউদ্দীন আহমদ কোরআন শরিফ পড়ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হাত-মুখ ধুয়েছিলেন। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কাপড় পরিবর্তন করে এসেছিলেন।

কী ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল না। কারাগারের কর্মকর্তারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারলেও সেনাসদস্যদের তৎপরতার সামনে অসহায় হয়ে পড়েন।

একপর্যায়ে চার নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তাঁদের ওপর গুলি ও বেয়নেট দিয়ে আঘাত করা হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। কারাগারের ভেতরেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চার মহান নেতার জীবন।

কেন হত্যা করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতাকে?

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে শুরু হয় নতুন অস্থিরতা। ইতিহাসবিদ ও সামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা কর্মকর্তারা সম্ভাব্য পাল্টা অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা কাজ করে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সব পরিকল্পনা ও নির্দেশের বিষয়টি নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণা ও বিচারিক নথির ভিত্তিতে আলোচনা করা প্রয়োজন।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, তবু অধরা অনেক আসামি

জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর মামলা দায়ের করা হলেও দীর্ঘ সময় বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে এগোয়নি। ১৯৯৬ সালে তদন্ত পুনরায় শুরু হয় এবং ১৯৯৮ সালে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর বিচারিক আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। কয়েকজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতেও মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পলাতক আসামিদের বিষয়ে বিচার সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা এবং হত্যাকাণ্ডের সব দায়ী ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনার দাবি এখনো আলোচনায় রয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন জাতীয় চার নেতা

সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান—এই চারজন শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক।

তাঁদের নেতৃত্ব, ত্যাগ ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ৩ নভেম্বর এলেই জাতি স্মরণ করে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সংঘটিত সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড।

জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং তাঁদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।

জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি দৈনিক রুদ্র খবরের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

একটি মন্তব্য লিখুন